নিউজ ফোর সাইড ডেস্ক :: পূর্ব মেদিনীপুরের সমুদ্র উপকূলবর্তী শংকরপুর। একদিকে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন, অন্যদিকে নোনাজলে ভেজা বাতাসের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে জাগ্রত দেবী নায়েকালীর মন্দির। দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ঐতিহ্য, স্থানীয় জনশ্রুতি এবং অগণিত মানুষের বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে এই মন্দির আজ এলাকার অন্যতম পরিচিত ধর্মীয় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
দিঘা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মন্দিরে প্রতিদিনই পুজো দিতে আসেন বহু ভক্ত। শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, দিঘা ও শংকরপুরে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছেও মন্দিরটি ক্রমশ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে।
প্রায় তিনশো বছরের প্রাচীন ইতিহাস
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় তিনশো বছর আগে এই মন্দিরের সূচনা হয়েছিল। সেই সময় শংকরপুর ছিল জঙ্গলঘেরা এক নির্জন উপকূলীয় অঞ্চল। কথিত আছে, একটি বেলগাছের নিচে থাকা পাথরের মধ্যে দেবীর মুখাবয়ব দেখতে পান স্থানীয় মানুষজন। এরপর থেকেই ওই পাথরকে দেবী নায়েকালীর প্রতীক হিসেবে পুজো করা শুরু হয়।
ধীরে ধীরে দেবীর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামগুলিতে। স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে মন্দির। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের পরিকাঠামো ও পুজোর আয়োজনেও আসে পরিবর্তন। তবে এত বছর পরেও দেবী নায়েকালীর প্রতি মানুষের ভক্তি ও বিশ্বাসে এতটুকু ভাটা পড়েনি।
আধুনিক সাজে নতুন আকর্ষণ মন্দির চত্বর
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্তমানে নতুন রূপে সেজে উঠেছে নায়েকালী মন্দির। রাজ্য সরকারের উদ্যোগে মন্দির চত্বরে আলোকসজ্জা, ফোয়ারা এবং সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর আলোয় ঝলমল করে ওঠে গোটা মন্দির প্রাঙ্গণ। আলোকসজ্জার সৌন্দর্য এবং শান্ত ধর্মীয় পরিবেশ পর্যটকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
সমুদ্রের গর্জন, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি এবং ধূপের সুগন্ধ মিলে এখানে তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ। ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্র দিঘা ও শংকরপুরে বেড়াতে এসে অনেকেই সময় বের করে নায়েকালী মন্দির দর্শনে পৌঁছে যান।
মৎস্যজীবীদের কাছে দেবী নায়েকালী ভরসার প্রতীক
সমুদ্রের সঙ্গে যাঁদের প্রতিদিনের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে, সেই মৎস্যজীবী ও উপকূলবর্তী এলাকার মানুষের কাছে দেবী নায়েকালীর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে অনেক মৎস্যজীবী মন্দিরে এসে দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন। তাঁদের বিশ্বাস, মায়ের আশীর্বাদ সঙ্গে থাকলে সমুদ্রযাত্রা নিরাপদ হবে এবং বিপদের সময় দেবী তাঁদের রক্ষা করবেন।
ভক্তদের বিশ্বাস, মা নায়েকালী ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন। সেই বিশ্বাস থেকেই বছরের পর বছর ধরে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন দেবীর দর্শনে।
সব মিলিয়ে শংকরপুরের নায়েকালী মন্দির শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উপাসনাস্থল নয়, এটি এলাকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, লোকবিশ্বাস এবং উপকূলবাসীর আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক বিশেষ পরিচয়। বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের অবিরাম গর্জনের মাঝেও তাই আজও অটুট রয়েছে জাগ্রত দেবী নায়েকালীর প্রতি মানুষের অগাধ ভক্তি ও আস্থা।



No comments:
Post a Comment